ফুল পরিচিতি পর্ব- ১
কৃষ্ণচূড়া একটি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিখ রেজিয়া (Delonix regia) এটি ফাবাসিয়ি (Fabaceae) পরিবারের অন্তর্গত একটি বৃক্ষ যা গুলমোহর নামেও পরিচিত। কৃষ্ণচূড়া বাংলাদেশের অতি পরিচিত একটি ফুল।
চৈত্র-বৈশাখ মাসের প্রচণ্ড গরমে যখন সবাই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখনই কৃষ্ণচূড়ার ডাল থোকা থোকা লাল ফুলে ভরে ওঠে। ফুলগুলো বড় চারটি পাপড়ি যুক্ত। শুধু গ্রীষ্মেই নয়, বর্ষায়ও কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে এই ফুল অপূর্ব মোহনীয় রূপে ফোটে। বর্ষার শেষেও এই ফুলের রেশ শেষ হয় না। তবে শীতের হিমেল হাওয়ায় গাছটির পাতাগুলো ঝরে যায়। কৃষ্ণচূড়া মাদাগাস্কারের শুষ্ক পত্রঝরা বৃক্ষের জঙ্গলে পাওয়া যায়। যদিও জঙ্গলে এটি বিলুপ্ত প্রায়, বিভিন্ন বিশ্বের অঞ্চলে এটি জন্মানো সম্ভব হয়েছে। সৌন্দর্য বর্ধক গুণ ছাড়াও, এই গাছ উষ্ণ আবহাওয়ায় ছায়া দিতে বিশেষভাবে উপযুক্ত। কৃষ্ণচূড়া উদ্ভিদ উচ্চতায় কম (সর্বোচ্চ ১২ মিটার) হলেও শাখা-পল্লবে এটি বেশি অঞ্চল ব্যাপি ছড়ায়। শুষ্ক অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে গেলেও, নাতিষীতোষ্ণ অঞ্চলে এটি চিরসবুজ। কৃষ্ণচূড়ার জন্মানোর জন্য উষ্ণ বা প্রায়-উষ্ণ আবহাওয়ার দরকার। এই বৃক্ষ শুষ্ক ও লবণাক্ত অবস্থা সহ্য করতে পারে। ক্যারাবিয়ান অঞ্চল, আফ্রিকা, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, বাংলাদেশ, ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশে এটি জন্মে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণচূড়া শুধু মাত্র দক্ষিণ ফ্লোরিডা, দক্ষিণ পশ্চিম ফ্লোরিডা, টেক্সাসের রিও গ্রান্ড উপত্যকায় পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেশে কৃষ্ণচূড়ার ফুল ফোটার সময় বিভিন্ন।
· দক্ষিণ ফ্লোরিডা – | জুন | · ক্যারাবিয়ান – | মে থেকে সেপ্টেম্বর |
· ভারত – | এপ্রিল থেকে জুন | · অস্ট্রেলিয়া – | ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি |
· আরব আমিরাত – | সেপ্টেম্বর |
রাধাচূড়া :
কৃষ্ণচুড়ার মত দেখতে হলেও হলুদ-লাল মিশ্রণের এই ফুলটির নাম রাধাচূড়া। রাধাচূড়ার আরও অনেক নামের মাঝে অরণ্য, রত্নগণ্ডি, সিদ্ধেশ্বর, গুলেটুর নাম গুলো বেশি শোনা যায়। Peacock Flower বা Red Bird of Paradise নামে পরিচিত এই ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Caesalpinia pulcherrima এই ফুলের আদি নিবাস দ্বীপদেশ মাদাগাস্কার। ফুল কখনো হলুদ কখনো লাল কখনোবা লাল হলুদের মিশ্রণ। এই গণের মোট প্রজাতি ১৫০ টি হলেও ভারত উপমহাদেশের ১০ টির বেশি প্রজাতি দেখা যায় না। গুল্মজাতিয় এই গাছটির ফুল শুধু শোভাবর্ধন করে না গাছটির পাতা, ফুল, ছাল, মূল সব অংশেই ঔষধিগুণ বিদ্যমান। তবে গর্ভাবস্থায় কোন রোগেই এই গাছের কোন অংশই ব্যাবহার করা উচিৎ নয়।
________________________________________________________
কনকচূড়া :
.jpg)
কনকচূড়া বৈজ্ঞানিক নাম- Peltophorum pterocarpum এবং Fabaceae পরিবারের সদস্য। কনকচূড়া/পেল্টোফরাম শ্রীলঙ্কা, আন্দামান, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়াইয় এন্ডেমিক প্রজাতি। প্রায় ২০ মিটার উচু, শাখায়িত, পত্রমোচী বড় গাছ। বাকল ধূসর। যৌগপত্র দ্বি-পক্ষল, ৩০-৫০*২০-৩০ সেমি, পক্ষ ৮-২৬ টি, পত্রিকা ক্ষুদে, ১*২ সেমি, উপর উজ্জল সবুজ, নিচ সাদাটে।গরমের শুরুতে গাছের কচি পাতার সাথে ফুল ফোটে।
________________________________________________________
পলাশ :
পলাশ বৈজ্ঞানিক নাম- Butea frondosa Roxb এই ফুলের আরো একটা নাম আছে- অরণ্যের অগ্নিশিখা। শীত আসলেই সব পাতা ঝরে গিয়ে গাছটি একেবারে ন্যাড়া হয়ে যায়। কিন্তু বসন্তকাল আসতে না আসতেই গাছটি গাঢ় লাল রঙের ফুলে ভরে ওঠে। তারপর গাছে পাতা জন্মাতে শুরু করে। এই পাতা জন্মানোর আগে, যখন কেবল ফুল ফুটতে শুরু করে, তখন পলাশ গাছ একদম লাল হয়ে যায়। ফুলের কুঁড়ি অনেকটা বাঘের নখের মতো, কিংবা কাঁকড়ার পায়ের মতো দুই ভাগে বিভক্ত। এই ফুল নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
__________________________________________________________________
চাঁপা :
চাঁপা বা চম্পা বৈজ্ঞানিক নাম Michelia champaca Linn এই ফুলটির নাম এসেছে সংস্কৃত ‘চম্পক’ থেকে। চাঁপা ফুলের গাছ চিরসবুজ। মানে গাছে সারা বছরই পাতা থাকে। পাতাগুলো লম্বাটে। আর ফুলের রঙ সাধারণত সাদা, হালকা হলুদ কিংবা সোনালি হতে পারে। বসন্ত থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত চাঁপা ফুল ফোটার সময়। বসন্তকালেই সবচেয়ে বেশি ফোটে। তবে এক শীতকাল ছাড়া প্রায় সব সময়েই চাঁপা ফুল ফুটতে দেখা যায়। চাঁপা ফুল নানা জাতের হয়। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় স্বর্ণচাঁপা আর হিমচাঁপা। স্বর্ণচাঁপা ফুলটির জন্মভূমি হিমালয়ের পাদদেশ। রং সোনালি হলুদ। আর হিমচাঁপার রং সাদা। আদিবাস উত্তর আমেরিকা। তবে বাংলাদেশের সমতলভূমিতে ফুলটি ভালোই জন্মায়। হিমচাঁপা গাছ ৩০ থেকে ৪০ ফুট উচু হয়। পাতা গাঢ় সবুজ, মোটা আর চওড়া। পাতার নিচে বাদামি রঙের প্রলেপ থাকে। সব চাঁপা ফুলেই মিষ্টি একটা গন্ধ থাকে।
__________________________________________________________________
কনকচাঁপা :
কনকচাঁপা এর বৈজ্ঞানিক নাম Ochna squarrosa, এই ফুলের গাছটি ছোট বৃক্ষ জাতীয় গাছ। ফুলের মঞ্জরি ছোট ছোট, কিন্তু অনেকগুলো একসঙ্গে থাকে।
পাতা যখন কচি থাকে, তখন রং থাকে তামাটে। কিন্তু পরিণত বয়সে পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের হয়ে যায়। তবে চাঁপা ফুল গাছের মতো সারা বছর গাছে পাতা থাকে না; শীতের শেষে পাতা ঝরে যায়। আর বসন্তে ফুলটির ঘন হলুদ সোনালি রঙের পাপড়ি আর তামা রঙের কচি পাতায় গাছের ডালপালা ছেয়ে যায়। আর ফুলটিতে মধুও থাকে। আর সেই মধুর লোভে জড়ো হয় রাজ্যের সব মৌমাছি আর ভ্রমর।
________________________________________________________
দোলনচাঁপা :
দোলনচাঁপা আমাদের দেশের খুবই পরিচিত একটি ফুল।এর বৈজ্ঞানিক নাম Hedyehium coronarium, ফুলটির আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ভারত।
প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৪০টি।গাছের ডালের মাথায় থোকায় থোকায় সাদা রঙের বড় বড় দোলনচাঁপা ফোটে।
সব দোলনচাঁপাই সাদা হয় না; হলদে কি লাল রঙেরও হয়। এই ফুল ফোটে বর্ষার বিকেলে ও সন্ধ্যায়। সারা রাত জুড়ে মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে সকাল হতে হতেই শুকিয়ে যায়। আর এই ফুলের সুবাসও পাওয়া যায় অনেক দূর থেকেই। শীতকালে দোলনচাঁপা গাছ শুকিয়ে যায় আবার গ্রীষ্মকালে তরতাজা হয়ে ফুল ফোটানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
________________________________________________________
কাঁঠালি চাঁপা :
কাঁঠালি চাঁপা উদ্ভিদ বিদ্যা অনুযায়ী এটি Annonaceae পরিবারের সদস্য; বৈজ্ঞানিক নাম Artabotrys hexapetalus, এর আদিনিবাস দক্
ষিণ চীন, মায়ানমার, ফিলিপাইন ও ভারতবর্ষ। আসলে এই ফুলের গন্ধটাই কেমন কাঁঠালের মতো। আর তাই ফুলটির নামই হয়ে গেছে কাঁঠালী চাঁপা। বিশেষ করে রাতের বেলায় ফুলটি গন্ধ ছড়ায়। ফুলটি প্রথমে থাকে সবুজ পরে ক্রমেই হলদে রঙের হতে থাকে। আর ফুল যখন হলদে হতে থাকে, তখনই , মাতাল করা সুগন্ধ বের হয়। নানা এলাকায় এর নাম ভিন্ন যেমন কাঁঠালি চম্পা বা হাড়ি চম্পা আবার ভারতবর্ষে এটি মনোরঞ্জিনী । এটি বড় আকারের কাষ্ঠল-লতানো গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি মাঝারি আকারের ৮-১০ ফুট লম্বা, তবে এর কাষ্ঠল লতা দীর্ঘ হয়ে থাকে। শাখা অবনত অর্থাৎ ঝুকেঁ থকে। কাঠালি চাঁপার উজ্জ্বল সবুজ পাতা ৪ থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়, পাতা “একান্তর” এবং চর্মবৎ। পত্রফলকের নিম্নতল ফ্যাকাশে সবুজ। পাতার কক্ষে একক বা ২-৩টি ফুল জন্মে। পাপড়ির সংখ্যা ৬ এবং খোলা। ফুলের বোঁটা বাঁকা, আঁকশির গড়ন। গুচ্ছবদ্ধ ফল গোলাকার। এই ফুলের নির্যাস সুগন্ধি তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। কাঁঠালী চাঁপা ফোটে বর্ষায়।
__________________________________________________________________
নয়নতারা :
নয়নতারা একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ এর বৈজ্ঞানিক নাম Catharanthus roseus, এটি Apocynaceae (dogbane, অথবা oleander পরিবার) পরিবারের একটি উদ্ভিদ।
বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামেও পরিচিত, যেমন Cape periwinkle, Madagascar periwinkle, periwinkle, sadabahar, sadaphuli, sadasuhagi, sadsuhagan ইত্যাদি। এর আরেকটি প্রজাতি হলো Vinca rosea। আদি নিবাস মাদাগাস্কার। বাংলাদেশ, ভারত ও আফ্রিকা সহ আরও বেশ কয়েকটি দেশে এঁর দেখা পাওয়া যায়। এটি বর্ষজীবী, কখনো কখনো অনেক বছর বেঁচে থাকতেও দেখা যায়। পাতা বিপরীত, মসৃণ, আয়তাকার বা ডিম্বাকৃতি। পাঁচ পাপড়ি বিশিষ্ট ফুল গোলাপি, হালকা গোলাপি, সাদা আবার কোনোটির রং হালকা নীল রঙের হয়।নয়নতারা ফুলে গন্ধ নেই । সারা বছর জন্মে, বীজের সাহায্যে বংশ বৃদ্ধি। এর ঔষধিগুণ রয়েছে ক্রিমি রোগে, মেধাহ্রাসে, লিউকেমিয়া, মধুমেহ, রক্ত প্রদরে, রক্তচাপ বৃদ্ধিত, সন্ধিবাত সহ নানা রোগে এঁর ব্যাবহার রয়েছে। বোলতা প্রভৃতির হুলের জ্বালায়/কীট দংশনে দ্রুত উপশম পেতে নয়নতারা ফুল বা পাতার রস ব্যাবহারের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।
__________________________________________________________________
নাগেশ্বর বা নাগকেশর :
নাগেশ্বর বা নাগকেশর Messua ferrea ফুলের রঙ সাদা। গোলাকার মুকুলের রঙ সবুজে-সাদা। ফুলের পাঁপড়ির রঙ আবার দুধ-সাদা।
নাগেশ্বর ফুলে বেশ সুগন্ধি হয়। বসন্তকালে যখন নাগেশ্বর ফুল ফুটতে শুরু করে, তখন ভ্রমরেরা নাগেশ্বরের গন্ধে পাগল হয়ে ওঠে। এই ফুল থেকে যেমন সুগন্ধি আতর তৈরি হয়, তেমনি নানা রোগের চিকিৎসাতেও ব্যবহৃত হয়। যেমন বমি- কাশি, তারপর আমাশয় হলে শুকনো নাগেশ্বর ফুল বেশ কাজে দেয়। নাগেশ্বর ফুলের গাছ বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেটে বেশ চোখে পড়ে।
__________________________________________________________________
বেলী ফুল:







Comments
Post a Comment